শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন

এই সময়ে ভারত–চীন উত্তেজনার নেপথ্যে

আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) ধরে। ভারত–চীন আবারও মুখোমুখি অবস্থানে। শুধু মুখোমুখি অবস্থানে বললে ভুল হবে, হাতাহাতি ও পাথর ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনাও ঘটেছে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে। ২৮ মে ভারতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বাড়তি সেনা মোতায়েনের ঘোষণাও আসে। উত্তর সিকিমের এই অঞ্চলে এর আগেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিন্তু কোনো মীমাংসা হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

বর্তমান বিরোধের সূচনা
সর্বশেষ এই বিরোধের সূচনাটি হয় ৫–৬ মে। মঞ্চটি ছিল পূর্ব লাদাখ, প্যাংগং হ্রদের উত্তর পারের এই অঞ্চলটিকে বলা হয় ফিঙ্গার–ফাইভ। ১৯৬২ সালের চীন–ভারত যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ময়দান ছিল এটি। এই অঞ্চলটির কর্তৃত্বের বিষয়টি এখনো বিতর্কের বিষয়। অনেকটা সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি প্রোটোকল মেনেই এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রিত হয়। মুশকিল হয়, যখনই কোনো একটি পক্ষ যখন অঞ্চলটিতে নিজের উপস্থিতি বাড়ায়। এবারও তাই ঘটেছে। তবে কোনো এক পক্ষ নয়, বরং উভয় পক্ষই কাজটি করেছে।

৫ মে লাদাখে এলএসির গালওয়ানে ভারতকে রাস্তা তৈরিতে চীন বাধা দেয়। একই সময় প্যাংগং হ্রদে ভারতীয় টহল দলকেও বাধা দেওয়া হয়। চার দিন পর ৯ মে সিকিম-তিব্বত সীমান্তে নাকুলায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে দুই দেশের সেনারা। দুই সেক্টরেই দুই দেশের সেনারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। ঢিল ছোড়াছুড়িও চলে। ভারত অভিযোগ করছে, চীনা সেনারা ভারতের সীমানায় ঢুকে পড়েছে। আর চীনের অভিযোগ, ভারতের আচরণ উসকানিমূলক।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এলএসির দুই পাশে উভয় পক্ষই তাঁবু ফেলেছে। চীনের দিকে তাঁবুর সংখ্যা ৮০–১০০, আর ভারত অংশে তাঁবুর সংখ্যা প্রায় ৬০টি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারতের দাবিকৃত এলাকা প্যাংগং হ্রদ, গালওয়ান উপত্যকা, লাদাখের ডেমচক ও সিকিমের নাথু লায় অন্তত ১০ হাজার চীনা সৈন্য অবস্থান করছে।

১০ বছর ধরে ভারত তার সীমান্ত এলাকায় সড়ক থেকে শুরু করে বিমানঘাঁটি পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে। আবার এই হিমালয় অঞ্চলের সীমান্ত ঘিরে চীনের তৎপরতাও বাড়ছে। এ সম্পর্কিত প্রতিবেদেন আল–জাজিরা বলছে, চীন নিশ্চিতভাবেই এই এলাকায় বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে ভারতকে ব্যস্ত রাখতে চায়। কারণ, সে চায় না ভারত তিব্বতের বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার বেশি সময় পাক। তবে মোটা দাগে সিকিমের নাথু লা, প্যাংগং হ্রদ ও গালওয়ানে চীনের বর্তমান তৎপরতার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো ভারত খুঁজে পাচ্ছে না।

এদিকে গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগের তির ছোড়া হয়েছে ভারতের দিকে। তারা বলছে, সীমান্তের চারপাশে ভারতের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারত অবৈধভাবে সীমান্ত এলাকায় চীন অংশে প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি করেছে। ফলে চীনের সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে একে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা দ্য ডিপ্লোম্যাট জানায়, গত জানুয়ারিতে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানে ভারতের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর–পূর্ব সীমান্ত এলাকায় নব–ভারসাম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধির ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন, যাতে চীন বা পাকিস্তানের দিক থেকে আসা যেকোনো মাত্রার ঝুঁকি সহজে মোকাবিলা করা যায়।

ভারত–চীন কিংবা ভারত–পাকিস্তানের মতো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি শব্দটির বহুবিধ ও সুচতুর ব্যবহার রয়েছে। সে যা–ই হোক, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা সম্পর্কে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলছেন, চীনের সীমান্তরক্ষীরা শান্তিবাদী। সীমন্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা কাজ করে। সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে নিজেদের মধ্যে থাকা যোগাযোগের উপায়গুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে চীন–ভারত উভয় দেশ। একই ধরনের বক্তব্য এসেছে ভারতের সেনাবাহিনীর দিক থেকেও। তারা বলেছে, পাশাপাশি দুটি দেশের মধ্যে সীমান্তে এমন ধরনের উত্তেজনা হতেই পারে।

এ ধরনের উত্তেজনা নিরসনে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৩ সালের ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারত–চীন সীমান্ত এলাকায় এলএসি ধরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশেরই আলোচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা। সীমান্ত নিয়ে যেকোনো বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় দেশ শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথ বেছে নেবে বলে ওই চুক্তিতে তারা প্রতিশ্রুত।

এলএসি ধরে উত্তেজনা বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীন সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৭ সালে ভুটানের দোকলাম এলাকায় মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল দুই দেশ। সে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন জুনিপার’ নামের অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে সেখানে ২৭০ সশস্ত্র সেনার সমাবেশ ঘটায়। ওই অবস্থানটি নেওয়া হয়েছিল চীনা সেনাসদস্যদের দ্বারা নির্মাণাধীন একটি সড়কের কাজ বন্ধের লক্ষ্যে। ওই সড়ক নির্মিত হলে তা ভারতীয় সীমানায় চীনাদের প্রবেশ অবারিত করত। সড়কটি তৈরি হলে তা দোকালায় ভারতীয় ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে ফেলত এবং চীনকে জামফেরি রিজে প্রবেশের সুযোগ করে দিত। এটি একই সঙ্গে চিকেন নেক নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডরের পথটিও তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিত। এই চিকেন নেক দিয়েই উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের সঙ্গে ভারতের বাদবাকি ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষিত হয়। ফলে এটি ভারতের জন্য ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মজার বিষয় হলো, যে স্থানটিতে দুই দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তা কিন্তু এদের কারও নয়। ওই স্থানটি মূলত ভুটানের। অথচ এই বিবাদে মূল দাবিদার ভুটানের দশা উলখাগড়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

সীমান্ত নিয়ে এই টানাহেঁচড়ার কারণ কী?
চীন–ভারত সীমান্তের এই অংশ ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। তিব্বতের চীন থেকে আলাদা হতে চাওয়া এবং তাতে ভারতের সমর্থন দেওয়া—এই সবই এখন ইতিহাস। এ নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয় ১৯৫৯ সালে যখন ভারত তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামাকে আশ্রয় দেয়, যাকে চীন মনে করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা। মূল সংকটের একদিকে আকসাই চীন, অন্যদিকে অরুণাচল। ভারতের অরুণাচলকে চীন নিজের দাবি করে। আর চীননিয়ন্ত্রিত আকসাই চীনকে দাবি করে ভারত। আকসাই চীনকে কোনোভাবেই ছাড়তে রাজি নয় চীন। এটি চীনের ভীষণভাবে দরকার, তিব্বতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য। এ তো গেল পশ্চিম অংশের সংকট।

পূর্ব অংশেও ঠিক একই রকম সংকট রয়েছে। আর তা হলো খোদ অরুণাচল নিয়ে। এর সীমান্তঘেঁষা একটি অংশ কোনো সময় এর পুরোটাই নিজের বলে দাবি করে আসছে চীন। ফলে এটি ভারতের জন্য বিরাট মাথাব্যথার কারণ। ১৯৬২–এর যুদ্ধের মধ্য দিয়েও দুই দেশ নিজেদের মধ্য দিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারেনি। এ নিয়ে দুই দিন পরপরই উত্তেজক পরিস্থিতি সেই সময় থেকে বিরাজ করছিল। ১৯৮০–এর দশকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চীনের নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারপর থেকে দীর্ঘদিন বড় কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ৭৩ দিনের যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা–ও যুদ্ধে গড়ায়নি মূলত ১৯৯৩ সালে হওয়া চুক্তিটির কারণে।

চীন জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে চায়। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে দেশটি তার উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এতে দুই দেশের মাঝখানে পড়ে রীতিমতো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে নেপাল ও ভুটান। এদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে চীন তার সম্পর্ক দিন দিন বৃদ্ধি করছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর আওতাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর জয়েন্ট ওয়ার স্টাডিজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারত–চীন সীমান্তে চীনের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অংশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি প্রতিনিয়ত চাপের মুখে থাকবে। দোকলামের মতো ঘটনা তাই এ অঞ্চলের জন্য নয়া–স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখা দেবে।

২০১৭ সালে দোকলাম উত্তেজনার পর ২০১৮ সালে উহানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বৈঠক হয়। সেখানে উভয় দেশই পরস্পরের অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। একই সঙ্গে ১৯৯৩ সালে হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি উভয় পক্ষই পুনরায় সমর্থন জানায়। কিন্তু সিকিম ও পূর্ব লাদাখের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ওই আলাপচারিতা মূলত কাগজে–কলমেই ছিল। উপরন্তু, আগের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখলেও পূর্ব দিকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বেই চীন তিব্বতের টর্সা নালা অভিমুখে যে সড়ক নির্মাণ করছে, তা তিব্বত ঘিরে চীনের কৌশল বাস্তবায়নের ইচ্ছারই প্রমাণ বহন করে।

সীমান্তে কার কী অবস্থা
দুই দেশ তাদের পার্শ্ববর্তী অন্য সব দেশের সঙ্গে মোটা দাগে সীমান্ত–বিরোধ অনেকাংশে মিটিয়ে আনলেও নিজেদের মধ্যে তারা বিরোধ জিইয়ে রাখছে। ১৯৬০–এর দশকেই নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত–বিরোধ নিষ্পত্তি করে চীন। একইভাবে ভারতও নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে অন্তত এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে কাজ করেছে। জন্মের পর থেকেই জম্মু–কাশ্মীর নিয়ে বিবদমান ভারত ও পাকিস্তান। এই সংকটের এখনো কোনো মীমাংসা হয়নি। সর্বশেষ কাশ্মীরে কেন্দ্র শাসন জারি করে চুড়ান্ত অবস্থান নিয়েছে ভারত, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে ভীষণভাবে সমালোচিত হয়েছে। এর বাইরে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা–বিরোধেরও একধরনের রফা হয়েছে। শুধু বড় সংকট হিসেবে এখনো রয়ে গেছে ভারত–চীন সীমান্ত, যাকে ‘ইচ্ছাজনিত সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করছেন বিশ্লষকেরা।

চীন–ভারত বিরোধ জিইয়ে থাকার কারণ
দুই দেশের মধ্যে চলমান শক্তিমত্তার বিরোধই এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। উভয় দেশই পরবর্তী কোনো একসময়ে প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করে অপর পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসে এ নিয়ে সমাধানে যেতে আগ্রহী। অর্থাৎ সংকট জিইয়ে রাখার মূলে রয়েছে আলোচনার টেবিলকে নিজের পক্ষে টানার শক্তি অর্জনের দূরবর্তী সমীকরণ।

মোদ্দাকথা, ভারত এ সংকট নিরসনের জন্য এমন এক পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছে, যখন তার সব ধরনের শক্তিমত্তা চীনের সমপর্যায়ের হবে। এত দিন চীনের অবস্থানও তা–ই ছিল। এখন এ দুই দেশেই পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হয়েছে। চীন এখন বিশ্ব শাসনের অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের নেতা সি চিন পিং এক নয়া–নীতি হাজির করেছেন দেশটির সামনে। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বশেষ কংগ্রেসে নিজের এই পথের প্রতি সবার সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন তিনি। চীন এখন সম্প্রসারণের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্ব শাসনের মঞ্চে পুরোদস্তুর হাজির হতে হলে চীনের নিজ অঞ্চলে সেরা হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আর ভারত? ভারত আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চায়। গত কয়েক দশকে চীনের সঙ্গে তার শক্তিমত্তার ব্যবধান বেড়েছে। তবে চীন এখন ভারত থেকে শক্তির বিচারে অনেকটাই এগিয়ে। দ্য ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, চীনের সামরিক ব্যয় বর্তমানে ভারতে সামরিক ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি। এদিকে ভারতে এখন কট্টর জাতীয়তাবাদী এক নেতা ও তাঁর দল বসে আছে ক্ষমতায়। দেশ পরিচালনায় হওয়া ও হতে থাকা সব ব্যর্থতা ঢাকতে জাতীয়তাবাদী জিগিরই তাঁর একমাত্র ভরসা। ফলে উভয় পক্ষের কাছেই বিদ্যমান এলএসি মেনে নিজ নিজ অঞ্চলে বসে থাকাটা দুরূহ।

চীনের তাই লক্ষ্য ভারতের একিলিস হিল হয়ে থাকা চিকেন নেক। আর ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে, যেকোনো মূল্যে এই চিকেন নেককে সম্প্রাসরণ না করতে পারলেও রক্ষা করা। ভারতের এমন আরেক একিলিস হিল হচ্ছে কাশ্মীর। চীনেরও এ ক্ষেত্রে দুর্বল জায়গা রয়েছে, আর তা হলো মুখ্যত তিব্বত। তাইওয়ান বা হংকংয়ের কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেত। কিন্তু সেগুলো সরাসরি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ওই দুই অঞ্চল নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেক দূর গড়িয়েছে। বর্তমানে হংকংয়ে যে বিদ্রোহ হচ্ছে এবং তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যা কিছু হচ্ছে, তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।

বর্তমান পরিস্থিতি পাতানো কি?
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চায়না পলিসি সেন্টারের পরিচালক অ্যাডাম নি আল–জাজিরাকে বলেন, বর্তমান এই উত্তেজক পরিস্থিতি এমনকি পাতানো হতে পারে। উভয় দেশই অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে জর্জরিত। ফলে উভয়েই শান্তি বজায় রাখতে আগ্রহী। বেইজিংয়ের সামনে বর্তমানে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে হংকং, জিনজিয়াং ও করোনা–পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মতো উল্লেখযোগ্য। রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো বিষয়। ফলে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর কোনো কারণ নেই বেইজিংয়ের দিক থেকে।

১৯৯০–এর পর থেকে উভয় দেশ পরস্পরের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়। এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্যের পরিমাণ ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি। এতে অবশ্য ভারত এখনো বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে। আর এটিই ভারতের অনেক বড় অস্বস্তির কারণ। এই অস্বস্তি থেকেই গত মাসে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার চীনা বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ আরোপ করে, যাকে ‘বৈষম্যমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করে চীন। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকেও ভালো চোখে দেখছে না চীন। এদিকে ভারতের সম্প্রসারণবাদী মনোভাবে অসন্তুষ্ট নেপাল। আর ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে বরাবরই অস্বস্তিতে রয়েছে। এই সবই এখন একসঙ্গে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে ভারতের বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলাসহ আগে–পরের নানা ধরনের ব্যর্থতা ঢাকতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের এমন একটি সীমান্ত উত্তেজনার এই মুহূর্তে ভীষণ রকম দরকার। ঠিক একই রকমভাবে এ ধরনের মহামারি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীনও চায় নিজের অভীষ্ট অর্জন করতে। বিশেষত হংকংয়ে যে নিরাপত্তা আইন বেইজিং শেষ পর্যন্ত করিয়ে নিয়েছে, তা এমন পরিস্থিতি না থাকলে সম্ভব হতো না বলে মনে করা হচ্ছে। আর এটিই সীমান্তে এ ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি উভয় পক্ষের পাতানো কি না, সে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুরাতন খবর

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© All rights reserved © 2017 nktelevision
Design & Developed BY Shera Web