
নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথিতে ৮ জন নিরাপত্তাকর্মী কর্মরত থাকলেও তাদের অনেকেই হাসপাতালের মূল ফটক ও চত্বরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন না।
অভিযোগ রয়েছে, কেউ আউটডোরে, কেউ ইনডোরে, আবার কেউ চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে হাসপাতালের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এজেন্সির মাধ্যমে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, মূল ফটক ও হাসপাতাল চত্বরের নিরাপত্তার দায়িত্বে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের পরিবর্তে সেলিম, শাকিল ও মনি নামের তিনজনকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে মনি শ্রবণপ্রতিবন্ধী বলে জানা গেছে। তারা পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
হাসপাতালের নথিপত্র অনুযায়ী, নিরাপত্তাকর্মী পদে কর্মরত ছিলেন মোট আটজন। তাদের মধ্যে মো. মোহন মারা গেছেন। বর্তমানে তালিকায় থাকা সাতজন হলেন—মো. সালাহ উদ্দিন, কামরুজ্জামান, বেলাল হোসেন, মো. মাহাবুবুর রহমান, মো. করিম, মো. জহির আহম্মেদ ও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মচারীর অধিকাংশই বর্তমানে নিরাপত্তার দায়িত্বে না থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও আউটডোরে ওয়ার্ডবয় বা অন্যান্য কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
‘টাকা তুলে’ বিকল্প নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের দাবি
নিরাপত্তাকর্মী পদে নিয়োগ পাওয়া মো. জহিরের সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, তারা আউটডোর বা ইনডোরে দায়িত্ব পালন করলেও নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে তিনজনকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে রেখেছেন। ওই ব্যক্তিরাই তাদের পরিবর্তে হাসপাতালের মূল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে নিরাপত্তাকর্মী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি বর্তমানে আউটডোরে একজন চিকিৎসকের বডিগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসপাতালের একজন রোগী আবদুল আল মামুন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। কিন্তু সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের তিনি মূল ফটক বা চত্বরে দায়িত্ব পালন করতে দেখেননি বলে জানান।
নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আরএমও রাজীব আহমদ চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে নিরাপত্তাকর্মী ওইভাবে নেই। বাইরের লোক দিয়ে নিরাপত্তার জন্য লোক রাখা হয়েছে। সরকারি চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা তুলে তাদের বেতন দেন বলেও তিনি জানান।
তবে সরকারি নথিতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে থাকা কর্মচারীদের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি জানেন না বলে জানান। পরে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নিরাপত্তাকর্মীর পাশাপাশি অন্য পদেও দায়িত্ব পরিবর্তনের অভিযোগ শুধু নিরাপত্তাকর্মী নয়, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বাবুর্চি পদে কর্মরত কয়েকজনকেও তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে বিভিন্ন বিভাগে কাজ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ চক্ষু বিভাগে, কেউ জরুরি বিভাগে, কেউ ওয়ার্ড মাস্টারের কক্ষে আবার কেউ সার্জারি বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, এসব পদে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মচারী নির্ধারিত কাজ করতে আগ্রহী নন। ফলে তারা নিজেদের সুবিধামতো হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিরাপত্তাহীনতায় রোগী-স্বজন
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন অসঙ্গতির কারণে রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। হাসপাতাল চত্বরে চুরি এবং দালালের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীদের নির্ধারিত পদ অনুযায়ী দায়িত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা দরকার।
তাদের দাবি, সরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের ইনডোর বা অন্যান্য বিভাগ থেকে সরিয়ে হাসপাতালের মূল ফটক ও চত্বরের নিরাপত্তায় দায়িত্ব দেওয়া হলে একদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply