
বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। একেকজন একেকবার কোলে নিচ্ছেন দেড় বছরের শিশু ফাতেমা আক্তারকে। আপনমনে খেলছে, হাঁটছে। কিন্তু সে জানে না—যে বাবা তাকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, সেই বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না।
মাত্র ১৮ মাস বয়সী ফাতেমা এখনো বুঝতে পারছে না, তার বাবা আর নেই। একদিন হয়তো বাবাকে খুঁজবে, জানতে চাইবে—‘বাবা কোথায়?’ কিন্তু তখন তাকে দেওয়ার মতো কোনো উত্তর থাকবে না।
ফাতেমা আক্তার চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় দুর্ঘটনায় নিহত সেনাসদস্য আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের একমাত্র কন্যা।
বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামের মুন্সী সর্দার বাড়ির সামনে পিয়াসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে পিয়াসের মরদেহ মাইজদী শহিদ ভুলু স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে।
নিহত পিয়াস নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ২০২৩ সালে বিয়ে করেন পিয়াস। স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার ও একমাত্র মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন।
পিয়াসের দুলাভাই জসিম উদ্দিন বলেন, ফাতেমা এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না। যখন বাবাকে কাছে পাবে না, তখন হয়তো বুঝবে বাবা কী। এত ছোট বয়সে বাবাকে হারিয়েছে—এই শূন্যতা তাকে কীভাবে বোঝানো যাবে, তা আমাদের জানা নেই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিয়াসের বাবা আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘আমার ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমার মরদেহ তার কাঁধে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ ছেলের মরদেহ আমার কাঁধে নিতে হলো।’
পিয়াসের বন্ধু আকরাম বলেন, ‘পিয়াস শুধু আমার বন্ধু ছিল না, ভাইয়ের মতো ছিল। সবসময় হাসিমুখে থাকত। সামনে আমাদের ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু তার আর ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হলো না।’
পিয়াসের মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, বন্ধু ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ১৮ মাসের শিশু ফাতেমা হয়তো আজও জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। সময়ের সঙ্গে সে বড় হবে, বাবার ছবি দেখে বাবাকে চিনবে—কিন্তু বাবার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতিটুকুও তার নিজের করে পাওয়ার সুযোগ হবে না।
Leave a Reply