
শরতের আগমনে পাকা তালের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামবাংলা। উপজেলার দশটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে এখন চলছে তালের রস দিয়ে নানা ধরনের পিঠা তৈরির আয়োজন। গৃহিণীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন তালের পিঠা তৈরিতে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও নতুন জামাইকে আপ্যায়ন করতেও তৈরি হচ্ছে বাহারি পিঠা।
ঐতিহ্যবাহী তালের রসের বড়া, কলাপাতায় মোড়ানো পিঠাসহ নানা ধরনের পিঠা তৈরি হচ্ছে মাটির চুলায়। কোনো কোনো পিঠা দীর্ঘ সময় ধরে কড়াই বা পাতিলে জ্বাল দিতে হয়। মাটির চুলার আঁচ আর তালের মিষ্টি ঘ্রাণে অনেক বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার এই পিঠা তৈরির ঐতিহ্য। আগের মতো এখন আর বাড়িতে বাড়িতে পিঠার আয়োজন হয় না। বাজারের দোকানেই বছরজুড়ে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পিঠা। ফলে ঘরের উঠানে বসে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন মিলে পিঠা বানানো, খাওয়া আর গল্প-আড্ডার সেই দিনগুলো যেন এখন শুধুই স্মৃতি।
তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেক গৃহিণী এখনও তালের রস সংরক্ষণ করে রাখছেন। পলিথিনে ভরে ফ্রিজে রেখে দিচ্ছেন তালরস। বছরের বিভিন্ন সময়ে ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন কিংবা অতিথিদের জন্য সেই সংরক্ষিত তালরস দিয়ে তৈরি করছেন পিঠা।
একসময় পিঠা খাওয়ার মৌসুমে বাড়িতে বাড়িতে মেহমান আসত। নতুন জামাইকে ঘিরে থাকত বিশেষ আয়োজন। নানা ধরনের পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন পরিবারের নারীরা। কখনো কখনো সারারাত ধরে চলত পিঠা খাওয়া, গল্প আর আড্ডা। স্বজনদের মিলনমেলায় মুখর হয়ে উঠত গ্রামের বাড়িগুলো।
বয়োজ্যেষ্ঠরা সেই দিনগুলোর কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের ভাষায়, সময় বদলেছে, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আগে যা দেখেছেন, যা খেয়েছেন, এখন সেসবই যেন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে।
শুধু পিঠা তৈরির ঐতিহ্য নয়, দিন দিন কমে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা তালগাছও। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে হারিয়ে যেতে পারে তালের রস ও তা ঘিরে থাকা নানা লোকজ সংস্কৃতি।
তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বেশি করে তালগাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, তালগাছ শুধু তালের রস বা পিঠার উৎস নয়, এটি গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নতুন প্রজন্মকে যেমন পিঠা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে, তেমনি বাড়াতে হবে তালগাছের সংখ্যাও।
আধুনিকতার স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও তালের পিঠার সেই ঘ্রাণ আজও মানুষকে ফিরিয়ে নেয় শৈশবের স্মৃতিতে—মাটির চুলার আঁচ, উঠানে বসে পিঠা বানানো আর আপনজনদের সঙ্গে রাতভর গল্প-আড্ডার সেই হারানো দিনগুলোতে।
Leave a Reply